Breaking News
Home / জেলা সংবাদ / গোবিন্দগঞ্জে চাল আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় পলাতক ১৪ জনই প্রকাশ্যে ইউপি নির্বাচনে প্রচারণায়

গোবিন্দগঞ্জে চাল আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় পলাতক ১৪ জনই প্রকাশ্যে ইউপি নির্বাচনে প্রচারণায়

গাইবান্ধা ঃ হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চাল আত্মসাত মামলার পলাতক মোট ১৯ আসামির মধ্যে ১৪ জনই প্রকাশ্যে ইউপি নির্বাচনে প্রচারণা চালাচ্ছেন। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে চেয়ারম্যান প্রার্থী এসব আসামিরা দিনরাত গণসংযোগ করছেন। নির্বাচনী সভায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। অবশিষ্ট পাঁচ আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউই গ্রেপ্তার হচ্ছেন না। গোবিন্দগঞ্জ নাগরিক কমিটির আহবায়ক মতিন মোল্লা বলেন, আসামিদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও প্রভাবশালী। আইনের চোখে তারা পলাতক। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। তিনি তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

(ছবিটি উপজেলার রাজাহার ইউনিয়নের আওয়ামী লীগে মনোনীত প্রার্থী আবদুল লতিফ সরকারের নির্বাচনী প্রচারণার)

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় এক অর্থবছরই ২ হাজার ২৫৩টি ধর্মীয়সভার অনুকূলে ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ হয়। যার মুল্য ২২ কোটি ৩ লাখ ২১ হাজার ৫৯০ টাকা। জাল কাগজপত্র তৈরি করে সম্পন্ন চাল আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এসব অভিযোগে চলতি বছর ২৬ আগষ্ট মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক মো. হোসাইন শরীফ বাদী হয়ে তাঁর কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়।

তাদের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জের পিআইও বাদে ১৮ জন আসামি গত ২৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেন। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি এস এম মজিবুর রহমানের যৌথ বেে এই আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট আট সপ্তাহের আগাম জামিন দেন এবং জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে গাইবান্ধা সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে আসামিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এ হিসেবে গত ২২ নভেম্বর জামিনের মেয়াদ শেষ হয়। আসামিরা গত ২১ নভেম্বর গাইবান্ধা সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে যান। ওইদিন আদালতে গণমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা আত্মসমর্পণ না করে বাড়ি ফিরে যান। এরপর থেকে ১৪ আসামি নির্বাচনী প্রচারণা ও অন্যরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দুই ধাপে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এরমধ্যে চতুর্থ ধাপে আগামি ২৬ ডিসেম্বর ১৬টিতে এবং ৫ জানুয়ারি প ম ধাপে একটিতে নির্বাচন হবে। ইউনিয়নগুলোর মধ্যে ১৪টিতে চেয়ারম্যান পদে ১৪জন দুদকের করা ধর্মীয় সভার নামে চাল আত্মসাত মামলার পলাতক আসামি। তারা হচ্ছেন কামদিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মোশাহেদ হোসেন চৌধুরী, কাটাবাড়িতে স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউর করিম, শাখাহারে আওয়ামী লীগের তাহাজুল ইসলাম, রাজাহারে আওয়ামী লীগের আবদুল লতিফ সরকার, সাপমারায় বিদ্রোহী প্রার্থী শাকিল আলম, দরবস্তের আওয়ামী লীগের শরিফুল ইসলাম, তালুককানুপুরে বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুর রহমান, নাকাইহাটে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল কাদের প্রধান, রাখালবুরুজে জাতীয় পার্টির শাহদাত হোসেন, ফুলবাড়ীতে জাতীয় পার্টির আবদুল মান্নান মোল্লা, কোচাশহরে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোশাররফ হোসেন, শিবপুরে আওয়ামীলীগের সেকেন্দার আলী মন্ডল, শালমারায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আমির হোসেন এবং কামারদহে বিদ্রোহী প্রার্থী শরিফুল ইসলাম রতন। এরমধ্যে শুধু কামারদহের নির্বাচন ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।

এবিষয়ে আইনজীবিরা বলছেন, ওই মামলার আসামিরা হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করেছেন। আগাম জামিনের মেয়াদ শেষেও তারা নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পন করেননি। আইনের চোখে তারা পলাতক আসামি। পুলিশ কিংবা দুদক তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে। এতে আইনের কোনো বাঁধা নেই। এ বিষয়ে আইনের ব্যাখ্যা কি! জানতে চাইলে জেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় মামলা হয়েছে। যাহা আমলযোগ্য এবং পরোয়ানাযোগ্য অপরাধ। গাইবান্ধার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলার বিচার কাজ চলবে। আমলযোগ্য মামলার ধারায় তদন্তকারি কর্মকর্তা (আইও) বা পুলিশ আদালতের পরোয়ানা ব্যতিরেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারে।

এ বিষয়ে মামলার বাদি ও দুদক রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক মো. হোসাইন শরীফ সাংবাদিককে বলেন, আসামিরা হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করায় আইনের ব্যপ্তয় ঘটেছে। তাদের গ্রেপ্তারে আইনগত কোনো সমস্যা নেই। তবে বিষয়টি কমিশনকে জানানো হবে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী এবিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি ইজার উদ্দিন তিনি সাংবাদিককে বলেন, এটা দুদকের মামলা, দুদকই ব্যবস্থা নিবে। গ্রেপ্তার করবে, না কি করবে, সেটা তারাই করবে। নির্দেশনা থাকলে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারবে। কিন্তু গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নির্দেশনা নেই।

দুদকের পক্ষের আইনজীবি আবু আলা মো. সিদ্দিকুল ইসলাম রিপু বলেন, হাইকোর্ট তাদের নিম্ন আদালতে (গাইবান্ধা সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে) আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা আত্মসমর্পণ করেননি। এ ক্ষেত্রে আদালত থেকে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিধান রয়েছে। আগামি বছরের ১৫ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ রয়েছে। আইনের চোখে পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে ইউপি নির্বাচনে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ করছেন। নির্বাচনী সভায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। যারা প্রার্থী নন, তারাও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউই গ্রেপ্তার হচ্ছেন না।

পলাতক প্রসঙ্গে সাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী শাকিল আহম্মেদের দাবি, তারা হাইকোর্ট থেকে জামিনের মেয়াদ বর্ধিত করে নিয়েছেন। জামিনে থেকেই তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই কথা বলেন কাটাবাড়ির প্রার্থী রেজাউর করিম ও তালুককানুপুরের প্রার্থী আতিকুর রহমান। তবে আসামিরা আগাম জামিন নিয়ে থাকলে তা বর্ধিত করার কোনো সুযোগ নেই বলে সাংবাদিককে জানান গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি।

এই মামলায় মোট ১৯ আসামির মধ্যে অবশিষ্ট ৫ আসামি হচ্ছেন বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন মহিমাগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান, গোবিন্দগঞ্জের পিআইও জহিরুল ইসলাম, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান (তৎকালীন) আকতারা বেগম, গুমানীগঞ্জে শরীফ মোস্তফা জগলুল রশিদ এবং গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর (তৎকালীন) গোলাপী বেগম। আসামিদের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জের পিআইও জহিরুল ইসলাম জামিনের আবেদন করেননি। মামলার বাদি হোসাইন শরীফ বলেন, দুদকের অনুসন্ধানে আত্মসাতের সত্যতা পাওয়ায় প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপজেলায় ২ হাজার ২৫৩টি ধর্মীয়সভা অনুষ্ঠিত দেখানো হয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তারা ওই সংখ্যক ধর্মীয়সভা অনুষ্ঠিত দেখিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র সৃজন (ভুয়া প্রকল্প সভাপতি দেখিয়ে) করেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন সংক্রান্ত কাগজপত্রে সকল সদস্যদের সই একই প্রকৃতির এবং একই হাতের লেখা। বিবরণে বলা হয়, তৎকালীন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ২ হাজার ২৫৩ জন প্রকল্প সভাপতির অনুকুলে ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিকটন চাল সরবরাহে ডিও ইস্যু করেন। পরে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর তাদের ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন হয়েছে মর্মে প্রত্যায়ন দেন। এভাবে ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

(ছবিটি উপজেলার রাজাহার ইউনিয়নের আওয়ামী লীগে মনোনীত প্রার্থী আবদুল লতিফ সরকারের নির্বাচনী প্রচারণার)

About parinews