প্রকল্প পরিচালক-নির্বাহী প্রকৌশলী-ঠিকাদার সিন্ডিকেট বিএডিসি’র কোটি টাকার খাল খননে ঘাপলা, কৃষকেরা দিশেহারা

0
31

গাইবান্ধা থেকে সংবাদদাতা  : বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের ( বিএডিসি) আওতায় কোটি টাকার খাল খনন কাজে ব্যপক অনিয়ম- দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্প পরিচালক, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মিলে নামে মাত্র খনন কাজ করে সিংহ ভাগ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ফলে একদিকে যেমন সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে, অন্যদিকে প্রকল্প এলাকার কৃষকদের উপকারের স্থলে অপুরুনীয় ক্ষতি হয়েছে। গাইবান্ধা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় (ক্ষুদ্রসেচ) সুত্র জানায়, ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে বৃহত্তর বগুড়া ও দিনাজপুর জেলা ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলার গিদারী খাল ১ কি:মি: ৮০০ মিটার , গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার গজারিয়া খাল ৬ কিলো ৭০০ মিটার ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মনোরঞ্জন খাল ৮ কি:মি: ৭০০ মিটার পুন:খনন কাজ হাতে নেওয়া হয়। খনন কাজ সম্পাদনে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দরপত্র আহবান করা হয়।

চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবার কথা রয়েছে। কিন্তু সদরের গিদারী খাল খনন কাজ এখনও শুরু না হলেও গজারিয়া ও মনোরঞ্জন খাল খননের কাজ প্রায় শেষ। ইতোমধ্য ঠিকাদারী প্রতিষ্টানগুলোকে ফাইনাল বিল ছাড় করেছে কর্তৃপক্ষ। সুত্র জানায়, সুন্দরগঞ্জের মনোরঞ্জন খাল পুন: খনন কাজে ৫টি লডে পাঁচটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টানকে কার্যাদেশ দেওয়া হলে তারা খনন কাজ শেষ করে।

এক নম্বর লডে কি বাড়ী থেকে বজড়া কি বাড়ী পর্যন্ত ২ কিলোমিটার খনন কাজ করেছেন রংপুরের ঠিকাদার আশরাফুল ইসলাম, দুই নম্বর লডে বজড়া কি বাড়ী থেকে নতুন দুলাল পর্যন্ত ১ কিলো ৯০০ মিটার কাজ করেছে ময়মনসিংহের শতদল এন্টার প্রাইজ, তিন নম্বর লডে নতুন দুলাল থেকে বোয়ালীয়া পর্যন্ত ১ কি:মি: ৫০০ মিটার খনন কাজ করেছে রাতুল এন্টার প্রাইজ, চার নম্বর লডে বোয়ালীয়া থেকে দক্ষিন সমস পর্যন্ত ১ কিলো ৬০০ মিটার করেছে বগুড়ার হাজী এন্টার প্রাইজ ও দক্ষিন সমস থেকে সমস কুঠিপাড়া পর্যন্ত ১ কি:মি: ৭০০ মিটার পুন:খনন কাজ করেছে রংপুরের বাবু এন্টার প্রাইজ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

প্রত্যেকটি লডে চুক্তিমুল্য ধরা হয়েছে বিশ লাখ টাকার উপরে। সেহিসেবে মনোরঞ্জন খাল পুনঃখনন কাজে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্ষাকালে ফসলের জমিতে জমে থাকা পানি খালে ফেলতে প্রতি লডে আটটি করে ইউড্রেন নির্মান করার কথা থাকলেও কোথাও পাঁচটি আবার কোথাও ছয়টি করে ইউড্রেন নির্মান করা হয়েছে। এছাড়া ইউড্রেনের স্লাপ বা ডানা খালের তলানী পর্যন্ত (আপ টু বোটম) দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি।

ডানা দেওয়া হয়েছে দেড় থেকে দুই মিটার। আর খালের উপরে দুই থেকে তিন ফিট বার্ম বা বকচর থাকার নিয়ম থাকলেও কোনো কোনো স্থানে বকচার এক থেকে দেড়ফুট করা হলেও বেশীর ভাগ অংশে বকচার করা হয়নি। স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করেন, স্কাভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে ঠিকাদার দিনে রাতে নিজের ইচ্ছেমতো খনন কাজ করেছে।

খালের কোথাও কোথাও নামে মাত্র খনন করা হয়েছে। ইউড্রেনের ডানা খালের তলানী পর্যন্ত না করে ছোট আকারে তৈরী করার কারনে জমিতে জমে থাকা পানি খালে ফেললেই বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে খালের দু’পাশের জমি ভেঙ্গে আবার খাল ভরাট হচ্ছে। জমি খালের ভিতরে ভেঙ্গে পড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

দক্ষিন সমস কুঠিপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুস সালাম (৫৫) আব্দুর রাজ্জাক (৫০) সামছুল হক (৫৫) লোকমান হাকিম লিচু ( ৩২) কলেজ ছাত্র আশাদুজ্জামান আপেল, রিংকু মিয়া সহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, ঠিকাদার ইচ্ছেমতো কাজ করলেও বিএডিসি’র কোনো তদারকি কর্মকর্তা এখানে আসেননি। এতে প্রতীয়মান হয়, কৃষকদের উপকারের কথা বলে খাল খননের নামে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরকারের লাখ লাখ টাকা পকেটে ভড়েছেন।

কাজের বিষয়ে কিছু জানতে চাইলে ঠিকাদার চাঁদাবাজির মামলায় জেলের ভাত খাওয়ানোর হুমকি দিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করেন। তারা আরও বলেন, গত কয়েক বছর আগেও এই খালটি নামে মাত্র খনন করা হয়েছিলো। বর্ষাকালে খালের দু’পাশ ভেঙ্গে খালটি আবার ভড়াট হয়ে যায়। সরকারের টাকা লুটপাট করতেই বিএডিসি বার বার এই খনন কাজ করছে।

জানতে চাইলে বিএডিসি’র (ক্ষুদ্রসেচ) রিজিয়ন গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী চিত্তরঞ্জন রায় ও সহকারী প্রকৌশলী মোঃ সাইদুর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এবিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। এবিষয়ে বৃহত্তর বগুড়া ও দিনাজপুর জেলা ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) এস. এম. শহীদুল আলম মুঠোফোনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে ডিজাইন ও স্টীমেট অনুযায়ী কাজ বুঝে নেওয়ার পর অর্থ ছাড় করার কথা নির্বাহী প্রকৌশলীর।

যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীসহ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসময় গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ না করতেও অনুরোধ করেন তিনি। এই প্রসঙ্গে বিএডিসি’র (ক্ষুদ্রসেচ) প্রধান প্রকৌশলী মোঃ জিয়াউল হক মুঠোফোনে বলেন, খাল খনন কাজে ডিজাইন মোতাবেক কাজ না করে অনিয়ম হলে , এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের উপর বর্তাবে। তাদের কারনে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে এটি কোনো ভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

2

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here